বিল গেটস এর জীবনী। বিল গেটস এর সফলতার গল্প - ২য় পর্ব। বিস্তারিত পড়ুন

মাইক্রোসফট এর শুরুর দিকের কথা

microsoft account, microsoft word, microsoft office, microsoft excel, microsoft teams, what is microsoft windows,

হাভার্ডে থাকা অবস্থাতেই বিল গেটস অ্যালেন কে সাথে নিয়ে তার আগের প্রোটোটাইপ এর ভিত্তিতে প্রকাশিত Intel 8080 CPU এর আরেকটি এডিশন MITS Altair 8800 বের করেন। এরপর থেকেই দুই বন্ধু স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন নিজেদের একটি সফটওয়্যার কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করার। Altair 8800 এর প্রকাশনার পর গেটস এই এডিশনটিতে নতুন কিছু প্রোগ্রাম যুক্ত করার জন্য যোগাযোগ করেন মাইক্রো কম্পিউটার প্রস্তুতকারী MITS এর সাথে।

MITS এর প্রেসিডেন্ট Ed Roberts এতে আগ্রহ প্রকাশ করেন এবং গেটস কে একটি ডেমো তৈরী করে দেখাতে বলেন। গেটস BASIC নামে একটি ডেমো তৈরী করে দেয়ার পর MITS এটিকে Altair 8800 এ ব্যবহার করে বিস্ময়কর ফলাফল পায়। এই সাফল্যের ফলে পল MITS কাজ করার সুযোগ পায়। আর পলকে সাহায্য করার জন্য হাভার্ড থেকে ছুটি নেন গেটস। পরে বিল গেটস তাদের সফটওয়্যার কোম্পানির স্বপ্ন বাস্তবে রূপ দিতে পলের সাথে পার্টনারশীপে নিউ মেক্সিকোর ‘’Albuquerque’ নামে এক এলাকায় ১৯৭৬ সালের ২৬ নভেম্বরে মেক্সিকোর বানিজ্য সচিবের অনুমতিক্রমে MITS এর আওতায় একটি প্রতিষ্ঠান খুলেন। এটই ছিল মাইক্রোসফট এর প্রথম অফিস।

 

MITS এর গণ্ডি থেকে মাইক্রোসফটের মুক্তি

MITS এর আওতায় গেটস যে মাইক্রোসফট প্রতিষ্ঠান শুরু করেছিলেন তা ১৯৭৭ সালে MITS থেকে সম্পূর্ণ আলাদা হয়ে সফটওয়ার ডেভেলপমেন্ট এর উপর কাজ শুরু করে। এইবার গেটস ভাবেন তার নিজ দেশে কোম্পানিকে নিয়ে যাওয়া উচিত। ব্যস! যেই চিন্তা সেই কাজ! মাইক্রোসফটকে নিউ মেক্সিকো থেকে স্থানান্তর করে নিয়ে আসা হল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন শহরের Bellevue নামক স্থানে। তিনি তার কোম্পানির জন্য বিভিন্ন ব্যাংকের জন্য লোন চেয়েছিলেন, কিন্তু নতুন বলে কেউ লোন দিতে রাজি হয় নি। কিন্তু গেটস হাল ছাড়েন নি। এক সময় তিনি লোন পেয়ে যান কাছের একটি ব্যাংক থেকে। তারপর আর পেছন ফিরে তাকাতে হয় নি।

 

মাইক্রোসফটের প্রথম অপারেটিং সিস্টেম

 মাইক্রোসফটের সফটওয়ার ডেভেলপমেন্ট কাজের অগ্রগতি দেখে ১৯৮০ সালে IBM তাদের নতুন কম্পিউটার IBM PC এর প্রোগ্রামিং কাজের দায়িত্ব মাইক্রোসফট কে দেয়। কোম্পানি গেটস এর কাছে তার BASIC সিস্টেমটি তাদের নতুন কম্পিউটারে ব্যবহারের অনুমতি চায়। একই সময় IBM জানায় যে তারা একটি নতুন ধরণের Operating System তাদের কম্পিউটারে ইন্সটল করতে চায়। গেটস তাদেরকে সেই সময়কার বিখ্যাত অপারেটিং সিস্টেম নির্মাতা কোম্পানি Digital Research (DRI) এর সাথে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন।

কিন্তু IBM এর সাথে Digital Research (DRI) এর আলোচনা বেশিদিন এগোয়নি। কারণ Digital Research (DRI) এর লাইসেন্স সম্পর্কিত শর্তাবলি পছন্দ হয় নি IBM কর্মকর্তাদের। ঠিক এই সময় IBM রিপ্রেজেন্টেটিভ জেক স্যামস, গেটস কে অনুরোধ করেন মাইক্রোসফট থেকে একটি নতুন অপারেটিং সিস্টেম তৈরী করার জন্য। চিন্তাটি গেটস এর মাথায় ঢুকে যায়, কিন্তু তিনি বুঝতে পারছিলেন না কিভাবে শুরু করা যায়। এর ঠিক কয়েক সপ্তাহ পর “86-DOS (QDOS)” নামে একটি ডেমো গেটস কে দেখানো হয় যেটি তখনকার Digital Research (DRI) তৈরী করা CP/M Operating System এর মত। এই সময় Seattle Computer Products (SCP) এর CEO, Tim Paterson মাইক্রোসফটের সাথে যৌথভাবে কাজটি করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। এর ফলে গেটস যেন দিশা পেলেন। তিনি বিনা দ্বিধায় SCP এর সাথে চুক্তি করেন এবং কিছুদিন পরই মাইক্রোসফট এককালীন ৫০০০০ ডলারের বিনিময়ে PC-DOS নামের একটি অপারেটিং সিস্টেম IBM এর কাছে হস্তান্তর করে। গেটস অপারেটিং সিস্টেম হস্তান্তর করলেও এটির স্বত্ব নিজের কাছেই রাখেন। কারণ IBM হয়তো এটি মাইক্রোসফটের পরিবর্তে নিজেদের প্রোডাক্ট বলে বাজারে ছাড়তে পারে এই ভয় ছিল তার মনে। এরপর তিনি এই অপারেটিং সিস্টেমটিকে নিজেদের পণ্য হিসেবে বাজারজাত করার সিদ্ধান্ত নিলেন।

            

মাইক্রোসফট উইন্ডোজের বাজারে প্রবেশ

২০ নভেম্বর, ১৯৮৫ সালে বিল গেটস এর স্বপ্ন সত্যি হল। মাইক্রোসফট বাজারে ছাড়লো নিজেদের তৈরী অপারেটিং সিস্টেম Microsoft Windows। এবারও IBM এর অন্য একটি কম্পিউটারের জন্য এই অপারেটিং সিস্টেম ডেভেলপ করা হয়েছিল যার প্রাথমিক নাম ছিল OS/2।

১৯৯১ সালে এই OS/2 কে IBM এর আওতা থেকে মুক্ত করে Microsoft Windows নামে সম্পূর্ণ আলাদাভাবে বাজারজাত শুরু করে মাইক্রোসফট। এরপর থেকে ধীরে ধীরে Microsoft Windows এর আরো এডিশন বাজারে ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিলেন বিল গেটস। আস্তে আস্তে বাজারে আসলো মাইক্রোসফটের Microsoft Windows অপারেটিং সিস্টেমের বিভিন্ন এডিশন। জনপ্রিয়তা পেতে লাগলো কম্পিউটার ব্যবহারকারীদের কাছে যার ফলে পেছনে পরে যায় Digital Research (DRI) এর তৈরী অপারেটিং সিস্টেম CP/M।

ভুল সিদ্ধান্তকন্ট্রোল+অল্টার+ডিলিট

বিল গেটসের উইন্ডোজভিত্তিক অপারেটিং সিস্টেমে কন্ট্রোল+অল্ট+ডিলিট চেপে কম্পিউটার আনলক করার সিদ্ধান্তটি ভুল ছিল। প্রথমে বিল গেটস একটি মাত্র ‘কী’ দিয়ে এ কাজ করার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু আইবিএমের নকশাকারী মাইক্রোসফটের জন্য কিবোর্ডে একটি অতিরিক্ত ‘কী’ রাখার ব্যাপারে অস্বীকৃতি জানায়। এ কারণেই মূলত তিনটি ‘কী’ চেপে গ্রাহকদের কম্পিউটার আনলক করতে বলা হয়েছিল। বিশাল ভুল বলে মনে হলেও সুবিধাটি যুগের পর যুগ ধরে উইন্ডোজ অপারেটিং সিস্টেমের অংশ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এ ব্যাপারে এতদিন কোন উচ্চবাক্য করা না হলেও সম্প্রতি বেশ জোড়ের সাথে গেটস এর প্রয়োজনীয়তা ছিল না বলে উল্লেখ করেন। কম্পিউটার ব্যবহারকারীরা যেন তাদের পিসি রিবুট করতে পারে সেজন্য বিশেষ সুবিধা হিসেবে ফাংশনটি তৈরি করেন আইবিএম পিসির নকশাকারী ডেভিড ব্র্যাডলি। সম্প্রতি সিনেটের কাছে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি সুবিধা কেন গেটস এবং মাইক্রোসফট একে লগইন সুবিধা হিসেবে ব্যবহার করছে তা বুঝতে সক্ষম নন বলে জানিয়েছেন।

বিলিওনিয়ার বিল গেটস

মাইক্রোসফট উইন্ডোজ বাজারে আসার পর বিল গেটস কে আর পেছনে তাকাতেই হয় নি। ধীরে ধীরে তার প্রচার প্রসারের পাশাপাশি অর্থ সম্পদ ও বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। ১৯৮৭ সালে তার ৩২ তম জন্মদিনের ঠিক আগের দিন Forbes পত্রিকার যুক্তরাষ্ট্রের ৪০০ বিলিওনিয়ারের তালিকায় উঠে আসে বিল গেটসের নাম। তাকে স্বীকৃতি দেয়া হয় বিশ্বের সবচাইতে কমবয়সী আত্মপ্রচেষ্টায় হয়ে ওঠা বিলিওনিয়ার নামে। তখন তার সম্পদের পরিমান ছিল ১.২৫ বিলিওন মার্কিন ডলার। তার এই স্বীকৃতির কয়েকদিন পূর্বেই তার ধন সম্পদের তালিকায় যোগ হয়েছিল আরো ৯০০ মিলিওন মার্কিন ডলার।

 

বিল গেটস এর জীবনে মেলিন্ডা আগমন

এত খ্যাতি, এত সম্মানের নায়ক বিল গেটস ব্যক্তিগত জীবনে অত্যন্ত সাধাসিধে জীপন যাপন করতে পছন্দ করতেন। তার এই সাধাসিধে জীপনে ১৯৯৪ সালের ১ জানুয়ারী স্ত্রী হিসেবে আগমন ঘটে ‘মেলিন্ডা’র। তাদের তিনটি সন্তান রয়েছে যারা হল মেয়ে জেনিফার ক্যাথেরিন ও ফোবি অ্যাডেলি এবং একমাত্র ছেলে ররি জন।

 
লেখক বিল গেটস

একজন সফল ব্যক্তি হওয়ার পাশাপাশি বিল গেটস লেখালেখিও করেন প্রচুর। বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় তার অসংখ্য গবেষণামূলক প্রবন্ধ, জার্নাল প্রকাশিত হয়েছে। ১৯৯৫ সালে মাইক্রোসফট এক্সিকিউটিভ Nathan Myhrvold ও সাংবাদিক Peter Rinearson এর সাথে যৌথভাবে লেখা তার বই The Road Ahead প্রকাশিত হয়। ১৯৯৯ সালে গেটসের ব্যবসায় প্রযুক্তির ব্যবহার বিষয়ক বই Business @ the Speed of Thought প্রকাশিত হয়। এছাড়া বিল গেটস কে নিয়ে অনেক ডকুমেন্টারি ফিল্ম হয়েছে যার মধ্যে ২০১০ সালে তৈরী Waiting for “Superman” এবং বিবিসি ডকুমেন্টারি সিরিজের The Virtual Revolution উল্লেখযোগ্য।

 

মাইক্রোসফট থেকে অবসর

বিশ্বের এক নম্বর ধনী এবং সফলতার জীবন্ত কিংবদন্তি হিসেবে যদি কাউকে অ্যাখায়িত করতেই হয়, তাহলে বিল গেটস নিঃসন্দেহে তার যোগ্য। ২০০৮ সালে তিনি মাইক্রোসফট থেকে অবসর নেন। অবসর নেয়ার পর তিনি তাঁর দাতব্য সংস্থ্যাগুলোর প্রতি মনোযোগ দেন। দরিদ্র দেশ গুলোতে এবং নানা ধরনের মহামারীতে তিনি অর্থ অনুদান করতে থাকেন। প্রযুক্তি যেন সবখানে পৌছতে পারে সেজন্য বিল গেটস নানা ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছেন এবং নিচ্ছেন। ২০১১ সাল পর্যন্ত বিল ও মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশনে গেটস তার সম্পত্তির এক-তৃতীয়াংশের বেশি দান করে দেয়ার পরও ৫৭ বছর বয়সী বিল গেটসের বর্তমান সম্পদ ৭২.১ বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ। বিশ্বের বিভিন্ন দাতব্য সংস্থায় দান করার ক্ষেত্রেও সকলের চেয়ে এগিয়ে বিল গেটস।


Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url